রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট কবিতা বাছাইকৃত ৬০ টি

You are currently viewing রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট কবিতা বাছাইকৃত ৬০ টি

৫৯। মঙ্গল-গীত

এত বড়ো এ ধরণী মহাসিম্ধু ঘেরা
হুলিতেছে আকাশ সাগরে,

দিন তুই হেথা রতি মোরা মানবের
শুধু কি মা, যাব খেল! ক’রে ।

ভাই কি ধাইছে গঙ্গা ছাড়ি” হিমগিরি,
মরণা বহিছে ফুল ফল,-__

শত কোটি রবি তারা আমাদের ঘিরি
গণিতেছে প্রতি দণ্ড পল ।

নাহ কি মা মানবের গভীর ভাবনা,
হৃদয়ের সীমাহীন আশা ।
জেগে নাই অস্তরেতে অনস্ত চেতনা,
জীবনের অনস্ত পিপাসা !
হদয়েতে শুক্ধ কি মা, উৎস করুণার
শুনি না কি ছুখীর ক্রন্দন ।
জগৎ শুধু কি মা গো তোমার আমার
ঘুমাবার কুন্ুম আসন ।

শুনো না কাহার ওই করে কানাকানি
অতি তুচ্ছ ছোটো! ছোটে! কথা ।

পরের হৃদয় লয়ে করে টানাটানি
শকুনির মতো। নিমমতা |

শুনো না করিছে কার। কথ। কাটাকাটি
মাতিয়া জ্ঞানের অভিমানে,

রসনায় রসনায় ঘোর লাঠালাঠি
আপনার বুদ্ধিরে বাখানে ॥

আছে মা, তোমার মুখে স্বর্গের কিরণ,
হৃদয়েতে উবার আভাস,
খুঁজিছে সরল পথ ব্যাকুল নয়ন,
চারিদিকে মতের প্রবাস।
আপনার ছায়া ফেলি আমরা সকলে
পথ তোর অন্ধকারে ঢাকি,
ক্ষুদ্র কথ ক্ষুদ্র কাজ ক্ষুদ্র শত ছলে
কেন তোরে ভুলাইয়া রাখি 1

তুমি এসো দূরে এসো পবিত্র নিভৃতে,
ক্ষুদ্র অভিমান যাও ভুলি ।

সযঘতনে ঝেড়ে ফেলো বসন হইতে
প্রতি নিমেষের যত ধুলি।

নিমেধের ক্ষুদ্র কথা, ক্ষুদ্র রেণু-জাল
আচ্ছন্ন করিছে মানবেরে,

উদার অনন্ত তাই হতৈছে আড়াল
তিল তিল ক্ষত্রতার ঘেরে ॥

(অনন্তের মাঝখানে দাড়াও মা আসি,
চেয়ে দেখো আকাশের পানে,
পড়,ক বিমল বিভা, পুর্ণ-বূপরাশি
স্বর্গমুখী কমল-নয়ানে ।
আনন্দে ফুটিয়া ওঠো শুভ্র কুর্যোদয়ে
প্রভাতের কুম্মমের মতো,
দাড়াও সাঘ়াহু-মাঝে পবিভ্র-হদয়ে
মাথাখানি করিয়া আনত ॥)

শোনো শোনে উঠিতেছে স্ুগন্ভীর বাণী
ধ্বনিতেছে আকাশ পাতাল ।

বিশ্ব-চরাচর গাহে কাহারে বাখানি
আদিহীন অন্তহীন কাল।

যাত্রী সবে ছুটিয়াছে শূন্য পথ দিয়া,
উঠেছে সংগীত কোলাহল,

ওই নিখিলের সাথে ক মিলাইয়া
মা, আমর। যাত্র। করি চল্‌ ॥

যাত্র। করি বুথা যত অহংকার হতে,
যাত্রা করি ছাড়ি হিংসা ছ্বেষ,
যাত্রা করি ন্বর্গময়ী কণার পথে
শিরে ধরি সত্যের আদেশ ।
যাত্রা করি মানবের হৃদয়ের মাঝে
প্রাণে লয়ে প্রেমের আলোক,
আয় মাগো যাত্রা করি জগতের কাজে
তুচ্ছ করি নিজ ছুঃখ শোক ॥

জেনো মা, এ সুখে ছুঃখে আকুল সংসারে
মেটে না সকল তুচ্ছ আশ,
ত। বলিয়া অভিমানে অনস্ত তাহারে
কোরো না কোরো না অবিশ্বাস ।
সুখ বলে যাহা চাই সুখ তাহা নয়,
কী যেচাই জানি না আপনি,
আধারে জ্বলিছে ওই, ওরে কোরো ভয়,
ভুজঙ্গের মাথার ও মণি।

কিছুই চাব না মাগো আপনার তরে,
পেয়েছি যা শুধিব সে খণ,

পেয়েছি যে প্রেম-স্ত্রধা হৃদয় ভিতরে,
ঢালিয়া তা দিব নিশিদিন ॥

সখ শুধু পায়! যায় স্থুখ ন। চাহিলে,
প্রেম দিলে প্রেমে পুরে প্রাণ,

নিশিদিন আপনার ক্রন্দন গাহিলে
ক্রুন্দনের নাহি অবসান ॥

দাড়াও সে অন্তরের শান্থি-নিকেতানে
চিরজ্যোতি চিরচ্ছায়াময় ।

ঝড়হীন রৌদ্রহীন নিভৃত সদনে
জীবানের অনস্ত আলয়।

পুণ্য-জ্যাতি মুখে লয়ে পুণ্য হাসিখানি,
অন্নপূর্ণা জননী সমান,

মহা সুখে স্ুখ-ছুঃথ কিছু নাহি মানি
করো সবে স্ুখ-শান্তি-দান ॥

মা, আমার এত জেনো হৃদয়ের সাধ
ভুমি হও লক্ষ্মীর প্রতিম1 £

মানবেরে জ্যোতি দাও, করো আশীবাদ
অকলঙ্ক মৃতি মধুরিমা ;

কাছ থেকে এত কথা বল নাহি হয়,
হেসে খেলে দিন যায় কেটে,

দুরে ভয় হয় পাছে না পাই সময়,
বলিবার সাধ নাহি মেটে ॥

কত কথ। বলিবারে চাহি প্রাণ-পণে
কিছুতে মা, বলিতে না পারি,
স্সেহমুখখানি তোর পড়ে মোর মনে,
নয়নে উলে অশ্রু-বারি |
সুন্দর মুখেতে তোর মগ্ন আছে ঘুমে?
একখানি পৰ্তি অব |

ফলুক সুন্দর ফল সুন্দর বুশ ্
আশীবাদ করো নস

(২)
চারিদিকে তর্ক উঠে সাঙ্গ নাহি হয় ;
কথায় কথায় বাড়ে কথা ।
সংশয়ের উপরেতে চাপিছে সংশয়
কেবলি বাড়িছে ব্যাকুলতা ।
ফেনার উপরে ফেনা, ঢেউ-পরে ঢেউ
গরজনে বধির শ্রবণ,
তীর কোন্‌ দিকে আছে নাহি জানে কেউ
হা হা করে আকুল পবন ।

এই কল্লোলের মাঝে নিয়ে এসে। কেহ
পরিপুর্ণ একটি জীবন,

নীরবে মিটিয়! যাবে সকল সন্দেহ,
থেমে যাবে সহক্স বচন।

তোমার চরণে আদি মাগিবে মরণ
লক্ষাহার! শত শত মত,

যে-দিকে ফিরাবে তুমি ছু-খানি নয়ন
সেদিকে হেরিব সবে পথ ।

অন্ধকার নাহি যায় বিবাদ করিলে,
মানে না বাহুর আক্রমণ,

একটি আলো ক-শিখা স্ুমুখে ধরিলে
নীরবে করে সে পলায়ন ।

এসো মা উবার আলো, অকলঙ্ক প্রাণ,

দাড়াও এ সংসার-আধারে ।
জাগাও জাগ্রত হৃদে আনন্দের গান,
কুল দাও নিদ্রার পাথারে ॥

চারিদিকে নশংসত। করে হানাহানি,
মানবের পাষাণ-পরান

শাণিত ছুরির মতে। বিঁধাইয়া বাণী
হৃদয়ের রক্ত করে পান।

তৃষিত কাতর প্রাণী মাগিতেছে জল.
উক্কাধার করিছে বষণ,

শ্যামল আশার ক্ষেত্র করিয়া নিম্ষল
স্বার্থ দিয়ে করিছে কষণ ॥

শুধু এস একবার দাড়াও কাতিরে
মেলি ছুটি সকরুণ চোখ,

পড়ক ছু-ফৌটা অশ্রু জগতের ‘পরে
যেন ছুটি বাল্সীকির শ্লোক ।

ব্যথিত করুক স্নান তোমার নয়ানে,
করুণার অম্ত-নির্রে,

তোমারে কাতর হেরি মানবের মনে
দয়। ভবে মানবের পরে ॥

সমুদয় মানবের সৌন্দষে ডুবিয়া
হও তুমি অক্ষয় সুন্দর |
ক্ষুদ্র রূপ নকীথা যায় বাতাসে উবিয়।
তুই চারি পলকের পর ।
“তামার সৌন্দযে হোক মানব সুন্দর
মে তব বিশ্ব হোক আলো ।
ভোমারে হেরিয়া যেন মুগ্ধ অস্তর
মানুষে মানুষ বাসে ভালো ॥

(৩)
আমার এ গান মা গে শুধু কি নিমেষে
মিলাঈবে হৃদয়ের কাছাকাছি এসে।
আমার প্রাণের কথা নিদ্রাহীন আকুলত৷
শুধু নিশ্বাসের মাতা বাবে কি মা ভেসে ।

এ গান তোমারে সদা ঘিরে যেন রাখে,
সত্যের পথের পরে নাম ধরে ডাকে।
সংসারের স্খে তখে চেয়ে থাকে তোর মুখে

চির-আশীবাদ সম কাছে কাছে থাকে ॥

বিজনে সঙ্গীর মতে? করে যেন বাস।
অন্ক্ষণ শোনে তোর হৃদয়ের আশ।

পড়িয়া সংসার-ঘোরে কাদিতে হেরিলে তোরে
ভাগ ক’রে নেয় যেন ছুখের নিশ্বাস ॥

সংসারের প্রলোভন যবে আসি” হানে
মধু-মাখ। বিষ বাণী ছুর্বল পরানে,

এ-গান আপন সুরে মন তোর রাখে পুরে
ইষ্টমন্ত্-সম সদ বাজে তোর কানে ॥

আমার এ গান যেন সুদীর্ঘ জীবন
তোমার বসন হয় তোমার ভষণ।

পৃথিবীর ধুলি-জাল ক’রে দেয় অন্তরাল
তোমারে করিয়। রাখে স্থন্দর শোভন ॥

আমার এ গান যেন নাহি মানে মানা,
উদার বাতাস হয়ে এলাইয়া ডানা
সৌরভের মাতা তোরে নিয়ে যায় ুরি ক’রে
_ খুঁজিয়। দেখাতে যায় স্বর্গের সীমানা ।

এ গান যেন রে হয় তোর ঞ্ুবতারা,
অন্ধকারে অনিমিষে নিশি করে সার।।

তোমার মুখের পরে জেগে থাকে স্েভ-ভরে
আকুলে নয়ন মেলি” দেখায় কিনার।।

আমার এ গান যেন পশি তোর কানে
মিলায়ে মিশায়ে যায় সমস্ত পরানে ;
তপ্ত শোণিতের মতে। বহে শিরে অবিরত,
মানন্দে নাচিয়। উঠে মহত্ের গানে ॥
এ গান বাঁচিয় থাকে যেন তোর মাঝে ।
আ খিতার! হয়ে তোর আখিতে বিরাজে।
এ যেন রে করে দান সতত নূতন প্রাণ
এ যেন জীবন পায় জীবনের কাজে ॥

যদি যাই মৃত্যু যদি নিয়ে যায় ডাকি
এই গানে রেখে যাব মোর স্সেহ আখি ।

যবে হায় সব গান হয়ে যাবে অবসান.
এ গানের মাঝে আমি যেন বেঁচে থাকি ॥


Leave a Reply