কাজী নজরুল ইসলাম তার সাহিত্য সৃষ্টিতে নানান কবিতা , গান, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি সংকলিত করেছেন। যদিও তিনি বিখ্যাত তার অনবদ্য কবিতাগুলির জন্য। কিন্তু তার ইসলামিক সঙ্গীত গুলিও সমানভাবে জনপ্রিয়। কাজী নজরুল ইসলাম তার ইসলামিক সঙ্গীত গুলিতে (মুসলমানদের সঙ্গীত শৈলীকে) এই ভাবধারা প্রকাশ করেছেন।
ইসলামিক কবিতা/সঙ্গীত ইতিকথা:
ইসলামিক সঙ্গীত ধর্মীয় সঙ্গীতকে নির্দেশ করতে পারে, যেমনটি ইসলামী জনসেবা বা ব্যক্তিগত ভক্তিতে সম্পাদিত হয়, বা আরো সাধারণভাবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গীত ঐতিহ্যের সাথে। ইসলামের প্রাণকেন্দ্র হল মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, হর্ন অফ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, ইরান, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়া।
ইসলাম একটি বহু-জাতিগত ধর্ম হওয়ার কারণে, এর অনুগামীদের সঙ্গীতের অভিব্যক্তি ব্যাপকভাবে বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন অংশের আদিবাসী ঐতিহ্য আজ মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় সঙ্গীত শৈলীকে প্রভাবিত করেছে। ইসলামের ভাষা আরবীতে “সঙ্গীত” শব্দটি (mūsīqā موسيقى) ইংরেজি বা অন্য কিছু ভাষার তুলনায় আরও সংকীর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং “এর ধারণা” অন্ততপক্ষে “ধর্মনিরপেক্ষ শিল্প সঙ্গীতের জন্য সংরক্ষিত ছিল; পৃথক নাম এবং ধারণার অন্তর্গত লোকগীতি এবং ধর্মীয় গানের প্রতি”।
একজন পণ্ডিতের মতে ইসলামিক সঙ্গীত সম্পর্কে সাধারণীকরণ করা হয়েছে যে এটি “সুর এবং তালের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সংগঠন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়”, যে “কণ্ঠের উপাদানটি যন্ত্রের উপর প্রাধান্য পায়”, এবং যে স্বতন্ত্র সঙ্গীতশিল্পীকে “অনুমতি দেওয়া হয় এবং প্রকৃতপক্ষে উত্সাহিত করা হয়, উন্নতি”
এই সমস্ত অঞ্চল সপ্তম শতাব্দীর ইসলামিক বিজয়ের অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যের মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল এবং সম্ভবত বাদ্যযন্ত্রের শৈলীগুলি বাণিজ্য পণ্যের মতো একই পথে ভ্রমণ করেছিল। যাইহোক, রেকর্ডিংয়ের অভাব, আমরা কেবল এই অঞ্চলগুলির প্রাক-ইসলামিক সঙ্গীত সম্পর্কে অনুমান করতে পারি।
ইসলাম অবশ্যই সঙ্গীতের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, কারণ এটি প্রথম খলিফার অধীনে বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে একত্রিত করেছিল এবং দূরবর্তী দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যকে সহজতর করেছিল। নিশ্চিতভাবেই, সুফিরা, মুসলিম রহস্যবাদীদের ভ্রাতৃত্ব, তাদের সঙ্গীত বহুদূরে ছড়িয়ে দিয়েছে।
এখানে কাজী নজরুল ইসলাম এর প্রখ্যাত ইসলামিক সঙ্গীত/কবিতা গুলি দেওয়া হলো।
কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামিক কবিতা/সংগীত
ঈদের চাঁদ
সিঁড়ি-ওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ
চাষা মজুর ও বিড়িওয়ালা;
মোদের হিস্সা আদায় করিতে ঈদে
দিল হুকুম আল্লাতালা!
দ্বার খোলো সাততলা-বাড়িওয়ালা, দেখো কারা দান চাহে,
মোদের প্রাপ্য নাহি দিলে যেতে নাহি দেব ঈদ্গাহে!
আনিয়াছে নবযুগের বারতা নতুন ঈদের চাঁদ,
শুনেছি খোদার হুকুম, ভাঙিয়া গিয়াছে ভয়ের বাঁধ।
মৃত্যু মোদের ইমাম সারথি, নাই মরণের ভয়;
মৃত্যুর সাথে দোস্তি হয়েছে – অভিনব পরিচয়।
যে ইসরাফিল প্রলয়-শিঙ্গা বাজাবেন কেয়ামতে–
তাঁরই ললাটের চাঁদ আসিয়াছে, আলো দেখাইতে পথে।
মৃত্যু মোদের অগ্রনায়ক, এসেছে নতুন ঈদ,
ফিরদৌসের দরজা খুলিব আমরা হয়ে শহিদ।
আমাদের ঘিরে চলে বাংলার সেনারা নৌজোয়ান,
জানি না, তাহারা হিন্দু কি ক্রিশ্চান কি মুসলমান।
নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই –
জুলুমের জিন্দানে জনগণে আজাদ করিতে চাই!
এক আল্লার সৃষ্ট সবাই, এক সেই বিচারক,
তাঁর সে লীলার বিচার করিবে কোন ধার্মিক বক?
বকিতে দিব না বকাসুরে আর, ঠাসিয়া ধরিব টুঁটি
এই ভেদ-জ্ঞানে হারায়েছি মোরা ক্ষুধার অন্ন রুটি।
মোরা শুধু জানি, যার ঘরে ধনরত্ন জমানো আছে,
ঈদ আসিয়াছে, জাকাত আদায় করিব তাদের কাছে।
এসেছি ডাকাত জাকাত লইতে, পেয়েছি তাঁর হুকুম,
কেন মোরা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মরিব, সহিব এই জুলুম?
যক্ষের মতো লক্ষ লক্ষ টাকা জমাইয়া যারা
খোদার সৃষ্ট কাঙালে জাকাত দেয় না, মরিবে তারা।
ইহা আমাদের ক্রোধ নহে, ইহা আল্লার অভিশাপ,
অর্থের নামে জমেছে তোমার ব্যাঙ্কে বিপুল পাপ।
তাঁরই ইচ্ছায় – ব্যাঙ্কের দিকে চেয়ো না – ঊর্ধ্বে চাহো,
ধরার ললাটে ঘনায় ঘোলাটে প্রলয়ের বারিবাহ!
আল্লার ঋণ শোধ করো, যদি বাঁচিবার থাকে সাধ ;
আমাদের বাঁকা ছুরি আঁকা দেখো আকাশে ঈদের চাঁদ!
তোমারে নাশিতে চাষার কাস্তে কী রূপ ধরেছে, দেখো,
চাঁদ নয়, ও যে তোমার গলার ফাঁদ! দেখে মনে রেখো!
প্রজারাই রোজ রোজা রাখিয়াছে, আজীবন উপবাসী,
তাহাদেরই তরে এই রহমত , ঈদের চাঁদের হাসি।
শুধু প্রজাদের জমায়েত হবে আজিকার ঈদ্গাহে,
কাহার সাধ্য, কোন ভোগী রাক্ষস সেথা যেতে চাহে?
ভেবো না ভিক্ষা চাহি মোরা, নহে শিক্ষা এ আল্লার,
মোরা প্রতিষ্ঠা করিতে এসেছি আল্লার অধিকার!
এসেছে ঈদের চাঁদ বরাভয় দিতে আমাদের ভয়ে,
আবার খালেদ এসেছে আকাশে বাঁকা তলোয়ার লয়ে!
কঙ্কালে আজ ঝলকে বজ্র, পাষাণের জাগরণ,
লাশে উল্লাস জেগেছে রুদ্র উদ্ধত যৌবন!
দারিদ্র্য-কারবালা-প্রান্তরে মরিয়াছি নিরবধি,
একটুকু কৃপা করনি, লইয়া টাকার ফোরাত নদী।
কত আসগর মরিয়াছে, জান, এই বাপ মা-র বুকে?
সকিনা মরেছে, তোমরা দখিনা বাতাস খেয়েছ সুখে!
শহিদ হয়েছে হোসেন, কাসেম, আসগর, আব্বাস,
মানুষ হইয়া আসিয়াছি মোরা তাঁদের দীর্ঘশ্বাস!
তোমরাও ফিরে এসেছ এজিদ সাথে লয়ে প্রেত-সেনা,
সেবারে ফিরিয়া গিয়াছিলে, জেনো, আজ আর ফিরিবে না।
এক আল্লার সৃষ্টিতে আর রহিবে না কোনো ভেদ,
তাঁর দান কৃপা কল্যাণে কেহ হবে না না-উম্মেদ !
ডাকাত এসেছে জাকাত লইতে, খোলো বাক্সের চাবি!
আমাদের নহে, আল্লার দেওয়া ইহা মানুষের দাবি!
বাঁচিবে না আর বেশিদিন রাক্ষস লোভী বর্বর,
টলেছে খোদার আসন টলেছে, আল্লাহু-আকবর!
সাত আশমান বিদারি আসিছে তাঁহার পূর্ণ ক্রোধ।
জালিমে মারিয়া করিবেন মজলুমের প্রাপ্য শোধ।

আমি Susmita Das একজন বাংলা কনটেন্ট রাইটার এবং ব্লগার। আমি বাংলা কবিতা, উক্তি ও জীবনী বিষয়ক লেখা তৈরি করতে ভালোবাসি। আমার লক্ষ্য হলো পাঠকদের জন্য সেরা অনুপ্রেরণামূলক ও মানসম্পন্ন বাংলা কনটেন্ট প্রদান করা। আমি নিয়মিত নতুন নতুন উক্তি, কবিতা এবং তথ্যবহুল পোস্ট প্রকাশ করি যাতে আপনারা প্রতিদিন কিছু শিখতে পারেন।
